জীবনে ব্যর্থ ৬ বিজ্ঞানীর সাফল্যের কথা

 জগতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা প্রকৃতি থেকে শেখেন। শৈশবেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ড্রপ আউট, অর্থনৈতিক অনটন, সামাজিক ভাবে নিগৃহীত, এমন অসংখ্য মানুষের গল্প আছে যারা শেষ পর্যন্ত সাফল্যের শিখরে আরোহণ করেছেন। নিজের জীবন পাল্টানোর সাথে সাথে পাল্টে দিয়েছেন বিশ্বজগত। আর সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে জগত পাল্টে দেওয়া এই মানুষগুলোকেই ইতিহাস ধারণ করে, পৃথিবী কুর্নিশ করে।
আজ এমন কয়েকজন দুনিয়া কাঁপানো বিজ্ঞানীর গল্প বলব যারা প্রথম জীবনে ব্যর্থ ছিলেন অথবা আবিষ্কারের সাধনায় ব্যর্থ হয়েছেন বারংবার, কিন্তু দমে যাননি। শেষ পর্যন্ত হয়েছেন শ্রেষ্ঠতম বিজ্ঞানী, পাল্টে দিয়েছেন হাজার বছরের বৈজ্ঞানিক ধারণা।

আলবার্ট আইনস্টাইন

জগতের আর সব মানুষ গড়ে নিজের মস্তিষ্কের ২ শতাংশ ব্যবহার করলেও আইনস্টাইন ব্যবহার করেছিলেন ৬ শতাংশ। photo: Singular Soul
একবার ভাবুন তো, ৭ বছর বয়সী কোনো শিশু মাত্র পড়তে শিখছে, তাকে নিয়ে এখনকার বাবা-মারা কতটা উদ্বিগ্ন হতেন? আলবার্ট আইনস্টাইনের জীবনের গল্পও এমন। হ্যাঁ, ৭ বছর বয়সে মাত্র পড়তে শেখেন তিনি আর কথা বলতে শেখেন ৪ বছর বয়সে। শৈশবে তার এই দুরাবস্থা দেখে অভিভাবক ও শিক্ষকরা ভেবেছিলেন যে, ছেলেটি মানসিক প্রতিবন্ধী, বয়স বাড়লেও তার শারিরিক, মানসিক বৃদ্ধি যথাযথভাবে হবে না। কিন্তু এই মানুষটিই এক সময় হয়ে উঠেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত বিজ্ঞানী। বিখ্যাত আপেক্ষিকতার সূত্র দিয়ে পাল্টে দিয়েছিলেন পদার্থ বিজ্ঞানের ইতিহাস।
পরবর্তীতে আইনস্টাইন এতটাই মেধাবী হয়ে উঠেছিলেন যে, তার সম্বন্ধে বলা হয় জগতের আর সব মানুষ গড়ে নিজের মস্তিষ্কের ২ শতাংশ ব্যবহার করলেও আইনস্টাইন ব্যবহার করেছিলেন ৬ শতাংশ। অথচ এই মানুষটা শৈশবে একবার স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, এমনকি ভর্তি হতে পারেননি পছন্দের পলিটেকনিক কলেজে। কিন্তু দমে যাননি তিনি। সব বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে হয়েছেন সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের একজন, অর্জন করেছেন নোবেল পুরস্কার।

চার্লস ডারউইন 


চার্লস ডারউইন; photo: biography
এবার এমন একজন বিজ্ঞানীর কথা বলবো যিনি বাবার চোখে ছিলেন অলস আর কল্পনাবিলাসী। কিন্তু তাকে চেনে না এমন বিজ্ঞান জানা মানুষ বর্তমান পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। ডারউইন ড্রপ আউট হননি, তবে শিক্ষার্থী হিসেবে মোটেও ভাল ছিলেন না। শিক্ষকদের চোখে তিনি সাধারণ ছাত্রদের চেয়েও নিম্নমানের ছিলেন।
এমনকি ভালো লাগছে না এমন কারণ দেখিয়ে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষা মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছিলেন! কিন্তু ব্যক্তিগত বিজ্ঞান চর্চা তাকে নিয়ে গিয়েছে অন্য এক উচ্চতায়।

টমাস আলভা এডিসন

সের্গেই আইজেনস্টাইন বলেছেন, “টমাস আলভা এডিসন হলেন পৃথিবীর সর্বকালের সর্বোত্তম আবিষ্কারক।” photo: daily asian age
বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন বৈদ্যুতিক বাতি, কিনেটোগ্রাফ ও ফনোগ্রাফের মতো বড় বড় আবিষ্কার করে মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করেছেন। মৃত্যুর পূর্বে হাজার খানেক বৈজ্ঞানিক প্যাটেন্ট ছিল তার নামে। সের্গেই আইজেনস্টাইন বলেছেন, “টমাস আলভা এডিসন হলেন পৃথিবীর সর্বকালের সর্বোত্তম আবিষ্কারক।” চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্যামেরা, ভিউয়ার, প্রজেক্টরসহ নানান জিনিস তিনি আবিষ্কার করেছেন।
অথচ তার স্কুল জীবন ছিল তিক্ততায় ভরা। ভর্তি  হওয়ার পর তিন মাসের বেশি স্কুলে টিকতে পারেননি। পড়ালেখায় মনোযোগ না থাকায় তার ওপর খুব বিরক্ত ছিলেন শিক্ষকরা। শিক্ষকদের এই বিরূপ আচরণে শিশু এডিসনের মনে যেন কোন খারাপ প্রভাব না পড়ে সেটা নিশ্চিত করতে এডিসনের স্কুল শিক্ষিকা মা স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বাসায় তাকে পড়ানো শুরু করেন।
তারপর মাত্র ১১ বছর বয়সেই বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর বই পড়ে ফেলেন তিনি। এভাবে একসময় স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নানা আবিষ্কারে পৃথিবী পাল্টে দেন।

রবার্ট স্টার্নবার্গ


নিজের চেষ্টা আর অদম্য ইচ্ছার কারণে রবার্ট স্টার্নবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ কৃতিত্ব অর্জনকারী ছাত্রে পরিণত হন, সাথে ‘বি.এ স্যুমা কাম লদে’, ‘পাই বিটা কাপ্পা’ ইত্যাদি সম্মাননায় ভূষিত হন। Photo: wyoming public media
এবার ভৌত বিজ্ঞানের গল্প নয়, বলবো এক মনোবিজ্ঞানীর কথা। রবার্ট স্টানবার্গ নামের এই মনোবিজ্ঞানী স্টার্নবার্গ ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ছাত্র ছিলেন। কলেজে পড়াকালীন একবার মনোবিজ্ঞানে ‘সি’ গ্রেড পান, যার ফলে মনোবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে তিনি বন্ধুবান্ধবসহ শিক্ষকদের উপহাসের শিকার হন। প্রারম্ভিক মনোবিজ্ঞান শ্রেণীতে এতটা দুর্বল থাকায় তার অধ্যাপক জোর দাবি করেছিলেন যে তিনি লেখাপড়া নয় বরং অন্য কোন কাজের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
কিন্তু নিজের চেষ্টা আর অদম্য ইচ্ছার কারণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ কৃতিত্ব অর্জনকারী ছাত্রে পরিণত হন, সাথে ‘বি.এ স্যুমা কাম লদে’, ‘পাই বিটা কাপ্পা’ ইত্যাদি সম্মাননায় ভূষিত হন। এত কৃতিত্বের পর একসময় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশনের সভাপতি নিযুক্ত হন।

রবার্ট গড্ডার্ড

আজকের আধুনিক বিশ্বের স্পেস ট্রাভেল, রকেট চালনা এসবই গড্ডার্ডের গবেষণার ফসল। photo: wikipedia
রবার্ট গড্ডার্ডের ভাবনা এতটাই সুদূরপ্রসারী আর গভীর ছিল যে তার সতীর্থ বিজ্ঞানীরাই তার ভাবনা মূল্যয়ন করতে পারেনি। তাদের কাছে গড্ডার্ডের ভাবনা এত বেশ কল্পনাবিলাসী মনে হয়েছে যে তাকে নিয়ে সবাই উপহাস করেছিলো। কিন্তু এই উপহাসে দমে যাননি তিনি, স্রোতের বিপরীতে গবেষণা চালিয়ে গেছেন। এমনকি সতীর্থদের এত অযত্ন অবহেলার পরও জীবদ্দশায় তার তরল জ্বালানী চালিত রকেটের গবেষণা মূল্যয়ন করেনি কেউ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আজকের আধুনিক বিশ্বের স্পেস ট্রাভেল, রকেট চালনা এসবই গড্ডার্ডের গবেষণার ফসল।

স্যার আইজ্যাক নিউটন


সাড়ে তিনশো বছর পূর্বে প্রকাশিত পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় এক বই ‘ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা’ রচনা করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন আইজ্যাক নিউটন photo: wikipedia
জ্যোর্তিবিদ্যার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মহাকর্ষ তত্ত্বসহ বহুল আলোচিত গণিতবিদ স্যার আইজ্যাক নিউটনকে কে না চেনে! প্রায় সাড়ে তিনশো বছর পূর্বে প্রকাশিত পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় এক বই ‘ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা’ রচনা করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন তিনি।
অথচ কলেজে পড়াকালীন খরচ চালানোর জন্য কলেজের বিভিন্ন স্থানে ভৃত্যের কাজ করেছেন। ছাত্র হিসেবেও খুব ভাল ছিলেন না। ছাত্রাবস্থায় বিশেষ কোনো কিছু করেছেন বলে ট্রিনিটি কলেজের কোন দলিলপত্র লেখা নেই। তারও পূর্বে পারিবারিক খামার পরিচালনায় হতাশাজনক ভাবে ব্যর্থ হন তিনি। অবশ্য পরবর্তী জীবনে ক্রমশ উন্নতি করেছেন।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, রবার্ট স্টার্নবার্গের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট ও বাবুল ভট্টাচার্যের ‘হলিউডের রাজনীতি ও চার্লি চ্যাপলিন’

Post a Comment

2 Comments